করোনা রোগীর লাশ দাফন/সৎকার

আমাদের আরও মানবিক হতে হবে

প্রকাশিত: ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৩, ২০২০

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের নজিরবিহীন সংক্রমনে বাংলাদেশেও আতঙ্ক আর উদ্বেগ সঞ্চারিত করেছে। বর্তমানে জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় চলছে লক ডাউন ও এই করোনা ভাইরাসের ভয়াল তাণ্ডব। আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ লাখের উপরে নারী-পুরুষ। এর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজারের উপরে মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশের ৫৮টি জেলায় ইতোমধ্যেই করোনায় ৪ হাজার ১৮৬ জন আক্রান্ত। মৃতের সংখ্যা ১২৭। প্রতিদিন করোনা জীবাণুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তদুপরি, মৃতদের দাফন, শেষকৃত্য নিয়ে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

করোনা মহামারীর বিস্তার কিভাবে, কিসের মাধ্যমে এবং কোন কোন প্রক্রিয়ায় হয়, সে ব্যাপারে বিস্তারিত গবেষণা এবং তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কেউ যদি সত্যিই করোনাঘটিত রোগে মৃত্যুবরণ করে থাকেন, তার লাশের মাধ্যমে এ রোগ সংক্রমণের কোনো প্রমাণ আজো মেলেনি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, তবুও উদ্বেগমুক্ত থাকার জন্য নিরাপত্তামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার, অর্থাৎ সুরক্ষার ব্যবস্থা করে যে কেউ করোনা রোগীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সাহায্য করতে পারেন। আর এটা ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্বও বটে। তবে করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করায় করোনা রোগে যারা মারা গেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের লাশের দাফন বা সৎকার করা যাচ্ছে না।

পত্রিকার খবরে জানা যায়, প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে মৃত, হিন্দু ব্যক্তির লাশের সৎকার করেনি স্বধর্মী আত্নীয়-স্বজনরা। হিন্দু ব্যক্তিটির লাশকে মুসলমানরা খাটিয়ায় বহন করে সৎকারের জন্য নিয়ে গেছে।

আমাদের দেশেও অবস্থা ভিন্ন নয়। নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার মাঘান ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামের এক ব্যক্তি করোনা সন্দেহে স্বজনরা মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে রেখে পালিয়ে যায় তার পরিবারের লোকজন। সেখানে তার মৃত্যু হয়। চিকিসৎকরা যোগাযোগ করলে লাশ নিতে আসেনি কেউ। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বে লাশ নিহতের স্বজনদের কাছে প্রেরণ করেন।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বখতারপুর গ্রামে জ্বর ও শ্বাস কষ্ট নিয়ে ২২ বছর বয়সি এক শ্রমিক মারা গেলে নিহতের দুই ভাই ও বাবা লাশ বহনের জন্য মসজিদের খাটিয়া চেয়েও পাননি। মসজিদের ইমাম মোয়াজ্জিনসহ গ্রামের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের অনুমতি না মিলায় খাটিয়া ছাড়াই দুই ভাই ও বাবা সাদা কাফনে মোড়ানো হতভাগ্য যুবকের মরদেহ কাধে তুলে গোপনে কবরস্থ করেছেন। এ ঘটনায় সবচেয়ে দুঃখজনক হলো ইচ্ছা থাকা সত্বেও মুসলিম রীতি-নীতি অনুযায়ী লাশ দাফন করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে তার নমুনা সংগ্রহের ফলাফলে করোনা আক্রান্ত ছিলনা।

সিলেটে এক প্রবাসী নারী হাসপাতালে মারা গেলে করোনা সন্দেহে কেউ তার লাশ নিতে আসেনি। তাই গোসল ও জানাজা ছাড়াই তাকে অন্য জেলার এক নির্জন স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। অথচ করোনায় তার মৃত্যু হয়নি। ঝিনাইদহে করোনার মতো উপসর্গে মৃত্যু হলে এক ব্যক্তির লাশের জানাজা ও দাফনের দায়িত্ব নিতে হয় সরকারকে। স্থানীয় ইউএনও জানাজা পড়িয়ে লাশটিকে কবর দিয়েছেন। তার কোনো স্বজন কাছে ছিল না।

মানুষ যে কারণেই মৃত্যুবরণ করুন না কেন, নিজ নিজ ধর্মমতে তার লাশের দাফন বা সৎকার করা অন্যদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। এটা নিঃসন্দেহে মানবতার তাগিদ এবং ধর্মীয় করণীয়। সবাইকে এই কর্তব্য পালনে যথাসময়ে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বজায় রেখে আরও উদার ও মানবিক হতে হবে।