হদি সম্প্রদায়: ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিপ্লব (পর্ব-১)

প্রকাশিত: ২:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২০

এক.
বর্তমানে নেত্রকোণা জেলার বরহাট্টা, নেত্রকোণা সদর, পূর্বধলা, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর, তারাকান্দা, হালুয়াঘাট, গৌরীপুর, শেরপুর জেলার নকলা, নালিতাবাড়ি, শেরপুর সদর, কিশোরগঞ্জ জেলার মিটামইন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হদিরা বসবাস করে। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে শুধু শেরপুরে বিভিন্ন আদিবাসীদের পরিসংখ্যানে হদি সম্প্রদদায় ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ১ গারোরা ছিল প্রথম।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের পর থেকে এদের মাঝে ভারত চলে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়। বর্তমানে হদিরা ভারতের আসাম, মেঘালয় রাজ্যসহ বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্বে বাংলাদেশে হদি সম্প্রদায়ের লক্ষাধিক লোকের বসবাস ছিল। এখন এ ভূখণ্ডে মাত্র ৭/৮ হাজার লোকের বসবাস করে। ২

শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি, ঝিনাইগাতী ও শেরপুর সদর উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নে ৪১টি গ্রামে ৯৫৭ টি পরিবার। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ফুলপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, গফরগাঁও, গৌরীপুর ও ধোবাউড়া উপজেলায় ৩০টি ইউনিয়নে ৬৪টি গ্রামে ৮৪২টি পরিবার। নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, নেত্রকোণা সদর ও পূর্বধলা উপজেলায় ৫০টি ইউনিয়নে ১২৬টি গ্রামে ২,১৪৩ টি পরবার বসবাস করে। ৩ এ হিসাব থেকে শেরপুরের নকলা উপজেলা বাদ পড়েছে। সেখানে হদিদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এরকম কিশোরগঞ্জের মিটামইন উপজেলাতেও কয়েকটি হদি পরিবারের বসবাস রয়েছে। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে শুধু শেরপুরেই ১৪ থেকে ১৫ হাজার হদি সম্প্রদায়ের লোকজনের বাস ছিল। ৪

হদি সম্প্রদায়ে শিক্ষার হার খুবই কম। মাত্র ৪/৫ জন লোক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। ১/২ জন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছে।
গারো, হাজং কোচসহ গারো পাহাড় অঞ্চলে বসবাসরত নৃ-গোষ্ঠীগুলোর চেহারার সঙ্গে হদিদের চেহারার সাদৃশ্য মেলে। গারো, হাজং নৃগোষ্ঠীর যেমন চুল সোজা, খড়খড়ে ও কালো, মাথার আকার সাধারণত গোল, নাক মাঝারি চ্যাপ্টা, নাকের গোড়া অক্ষিকোটর থেকে যথেষ্ট উন্নত হয়। কিন্তু কপোল তলদেশের হাড় প্রশস্থ ও উন্নত বলে মুখ দেখে মনে হয় সমতল। তেমনি হদিদের চেহারারও মিল রয়েছে। এ সকল কারণগুলো নির্ণয় করে অনেক নৃতাত্ত্বিক হদিদের মঙ্গোলীয়ান নরসমাজের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষও অন্যান্য আদিবাসী উপজাতি জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে হদিদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মিল দেখে সহজেই নৃ-তত্ত্ববিদদের অনুমানকে অনুমোদন দেয়।

হদিরা মূলত ইন্দুমঙ্গোলয়েড নরগোষ্ঠীর একটি শাখা সম্প্রদায়। ৫ আসাম থেকে এসে বাংলায় বসতি স্থাপন করেছে, এদের মধ্যে হদি সম্প্রদায় একটি। এদের ভাষা বোডো (কাচারী) ভাষা গ্রুপের অন্তর্গত ছিল বলে অনেক নৃ-বিজ্ঞানী মনে করেন। সুতরাং গারোদের সঙ্গে এদের পূর্ব সম্পর্ক থাকাই স্বাভাবিক। ৬ গারোদের জনশ্রুতি অনুযায়ী হদিরা আদিতে গারো সম্প্রদায়ের দো-আল গোত্রের লোক ছিল। গারোদের মত সাংমা, মারাক ইত্যাদি গোত্রে বিভক্ত ছিল। ৭ হদিদের দৈহিক গড়নে হাজং ও কোচ-রাজবংশীদের সঙ্গেও সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এ কারণে এদের আদি কোচদের একাংশ হিসেবে অনেক নৃ-বিজ্ঞানী মনে করেন। গারোদের অপর আর এক জনশ্রুতিতে পাওয়া যায় কামরূপ ও বঙ্গদেশের সীমান্তে, পরবর্তীতে বঙ্গদেশ ও পূর্বে কোচ রাজ্যের সীমান্তের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী বরাবর যারা বসবাস করতো তাদেরই ঐড়ফ (হদ) বলা হতো। ৮

আসলে এরা গারো সম্প্রদায়ের একাংশ। গারোরা যেমন তাদের গোত্রকে মাহারী বা মাচং বলে, হদিরা একে দুখু বলতো। প্রাচীনকালে মানকিন, দফো, চাম্বুগং, চিরান প্রভৃতি মাহারীর গারো সম্প্রদায় থেকে হদিরা পৃথক হয়েছে। ৯ গারোদের ধারণা উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হদিরা গারো সম্প্রদায় থেকে সরে পড়ে সনাতন ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

তথ্য নির্দেশ ও টিকা:
১. নাগবংশের ইতিবৃত্ত সেরপুর টাউনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: শ্রীবিজয়চন্দ্র নাগ, সেরপুর টাউন, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ
২. গারো পাহাড় অঞ্চলের আদিবাসী: আলী আহাম্মদ খান আইয়োব, শোভা প্রকাশ, ঢাকা, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ
৩. বেসরকারি সংস্থা ‘সেড’ এর জরিপ,২০১৪ খ্রিস্টাব্দ
৪. হদি ইতিবৃত্ত: স্বর্ণকান্ত হাজং, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের ২৫ বৎসর পূর্তি উৎসব, ২০০২ বিশেষ স্মরণিকা।
৫. মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী: প্রমথ গুপ্ত, কালান্তর প্রকাশনী, কলিকাতা, ১১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ
৬. গারো পাহাড় অঞ্চলের আদিবাসী: আলী আহাম্মদ খান আইয়োব, শোভা প্রকাশ, ঢাকা, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ
৭. বাংলাদেশে গারো সম্প্রদায়: সুভাষ জেংচাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ
৮. পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ (তৃতীয় ভাগ): জেমস্ ওয়াইজ, অনুবাদ: ফওজুল করিম, আইসিবিএস ফাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০২ খ্রিস্টাব্দ
৯. বাংলাদেশে গারো সম্প্রদায়: সুভাষ জেংচাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ

চলবে……