দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ: পাল্টে যাচ্ছে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চেহারা

প্রকাশিত: ১২:৫২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২০

প্রতীতি ডেস্ক: সারাদেশেই দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণে এগিয়ে চলছে দেশের শিক্ষাখাত। বর্তমান সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে সারাদেশে পরিবেশ বান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। বিশেষ করে এ খাতে বিগত পাঁচ বছরে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায়ে ভবন নির্মাণে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য কমেছে। গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক ভবনের ভঙ্গুর চিত্র এখন আর নেই। গাছের নিচে কিংবা ভাঙা বেড়ার ঘরে বসে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের দৃশ্য এখন অতীত। শহর কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন আর দেখা মেলে না এমন প্রতিষ্ঠানের।

সরকারের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, সরকারের রুপকল্প-২০২১ ও ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৪) বাস্তবায়নে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ রয়েছে। আর এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে গত ১১ বছরে এ পর্যন্ত ২৬ হাজার ২২৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ কার্যক্রম গ্রহন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১২ হাজার ৭১১টির ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে আরো সাড়ে ১৩ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসায় নতুন ভবন নির্মাণ কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। সারাদেশে আরও ১৫০০ কলেজে মেয়েদের জন্য হোস্টেল নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করা হয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। এজন্য প্রতিটি ভবনে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য র‌্যাম্প, টানা বারান্দা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখা, ছাদে লাল টালি দিয়ে ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।

জানা যায়, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্রছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়া কমে যাওয়াসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রই রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। শিক্ষার অগ্রগতিতে গত এক দশকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সরকারি ভাষ্য নয় বরং বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ আন্তর্জাতিক দাতা ও গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশের শিক্ষার অগ্রগতিকে অন্যদের জন্য উদাহরণ অভিহিত করে বলছে, শিক্ষায় প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিক্ষার অন্যান্য সূচকের চেয়ে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার নানা উন্নয়ন কর্মকান্ড হাতে নিয়েছে। আর আমরা এখন টেকসই শিক্ষার দিকে নজর দিয়েছি। আমাদের ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য আমরা শহর-গ্রামের শিক্ষার মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখতে চাই না। সবখানেই আমাদের গুরুত্ব সমান। বরং গ্রামের শিক্ষার দিকে একটু বেশিই গুরুত্ব দিচ্ছি। এখন গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনের চেহার আগের মতো ভঙ্গুর নেই। সেখানে নতুন নতুন দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দিন দিন শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এজন্য অবকাঠামো বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা ভালো ক্লাসরুম পেলে তাদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়বে। সব মিলিয়ে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে তা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষা খাতে সরকারের এসব পদক্ষেপের ফলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে, যার সুফল পাবে জনগণ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন ও অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষায় অবকাঠামো নির্মাণে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। গত ১১ বছরে এ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার মাদ্রাদায় ভবন নির্মাণের জন্য তালিকাভুক্ত হয় এবং ইতিমধ্যে আড়াই হাজার মাদ্রাসায় ভবন নির্মাণ সমাপ্ত হয়েছে। এর বাইরে ৭টি বিভাগীয় শহরে আটটি মহলিা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনে প্রকল্প হতে নেয়া হয়েছে। বিজ্ঞান ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবসহ ১০০টি মাদ্রাসার ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, তিন পার্বত্য জেলায় আবাসিক স্কুল, কলেজ নির্মাণ, দেশের প্রতি উপজেলায় নতুনভাবে জাতীয়করণকৃত স্কুল ও কলেজ উন্নয়ন এবং হাওর ও চরাঞ্চলে আবাসিক স্কুল স্থাপন করতে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এগুলোর আগামী ২০২২ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। আর সাধারণ শিক্ষার সাথে ধারবাহিকতা রেখে ভোকেশনাল/প্রিভোকেশনাল কোর্স চালু করতে দেশের ৬৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪৬টিতে শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলতি বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে উন্নয়ন খাতে নির্মিত হবে প্রায় আট হাজার ৮২৩টি নতুন ভবন। আর এ সময়ের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় এক হাজার ৫০০ ভবন নির্মিত হবে রাজস্ব খাতের আওতায়। এসব ভবন নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)।

জানা যায়, উন্নয়ন খাতে নির্বাচিত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তিন হাজার ভবন নির্মিত হবে। তিন হাজার ২৫০টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভবন ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হবে। এক হাজার ৮০০ মাদরাসার উন্নয়নে নতুন ভবন নির্মিত হবে। বিদ্যমান ২০০টি সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে ভবন (পরীক্ষার হলসহ) নির্মাণ করা হবে।

এ ছাড়া চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, নতুন করে ২৩টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, চারটি সার্ভে ইনস্টিটিউট ও চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হবে। এ বিদ্যমান ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ৩৮৯টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন করা হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুনভাবে জাতীয়করণকৃত ৩ শতাধিক স্কুল ও ৩০৪টি কলেজের অবকঠামো উন্নয়ন করা হবে। পুরনো ৩২৩টি সরকারি স্কুল, ঢাকা মহানগরীর কাছাকাছি ১০টি সরকারি স্কুল নির্মাণ, জেলা পর্যায়ে ৭০টি স্নাতকোত্তর সরকারি কলেজের ভবন নির্মাণ, হাওর এলাকায় নির্বাচিত উপজেলা শহরে ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। এটি প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২২ সালে। প্রতিবেদন বলছে, এছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩টি আঞ্চলিক অফিস স্থাপন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এগুলো ২০২১ সালের মধ্যে শেষ করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে-মেয়ের জেন্ডার সমতা নিশ্চিত হলেও উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে তা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ দূরদূরান্তে কলেজগুলোর অবস্থান। নিজ বাড়ি থেকে কলেজের অবস্থান দূরে হওয়ায় অনেক ছাত্রীই ভর্তি হয় না। আবার অনেকে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েও পড়ালেখা শেষ করে না।

সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বুলবুল আখতার বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত, টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এ ব্যাপারে কোনোরুপ ছাড়া দেয়া হচ্ছে না। এমন একটা সময় আসবে এমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মিত না। সে দিন বেশি দূরে নয়। তিনি আরও বলেন, ছাত্রছাত্রীদের পাঠদানের উপযোগী আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব একাডেমিক ভবন নির্মাণে আমরা বেশি জোর দিচ্ছি।
সূত্র: ভোরের ডাক