গাছ উজাড় ও জমি জবর-দখল মামলা আতঙ্কে খাসিয়ারা মতবিনিময়ে জড়িতদের গ্রেফতার দাবী

আব্দুল কুদ্দুস আব্দুল কুদ্দুস

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৯:২৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০২০

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লবণছড়া পান পুঞ্জিতে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে ১৫টি জুমের পান বিনষ্ট করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার (২১ নভেম্বর) বিকেল ২টায় এই ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর ওইদিন লবণছড়া পুঞ্জির প্রধান বব্রিন খাসিয়া বাদী হয়ে কুলাউড়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এদিকে বনবিভাগ দাবী করছে, লবণছড়া বাঁশমহালে খাসিয়ারা টিনশেড ঘর তৈরী করার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছলে খাসিয়ারা দলবদ্ধ হয়ে বনবিভাগের কর্মকর্তাদের উপর লাটি-সোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। এতে বনবিভাগের কর্মকর্তা ও সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীসহ ৫ জন আহত হন। তাদেরকে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বনবিভাগের পক্ষ থেকেও মামলা দায়ের করা হয়েছে।
লবণছড়া পুঞ্জির প্রধান বব্রিন খাসিয়া জানান, শনিবার (২১ নভেম্বর) কর্মধা ইউনিয়নের নলডরি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন লিটনের নেতৃত্বে বিকেল ৩টায় ৩০-৪০ জন লোক হঠাৎ পুঞ্জির বিভিন্ন পানজুমে উঠেন। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা ১০-১১টি জুমে হামলা চালিয়ে এলোপাতাড়িভাবে জুমের পান কেটে বিনষ্ট করে। তিনি আরো জানান, পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাটি তারা ঘটিয়েছে। এতে প্রায় ৫ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাৎক্ষণিক ঘটনাটি ইউএনওসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে জানানো হয়েছে। তবে পুঞ্জির লোকজন এখনও বেশ আতঙ্কে রয়েছেন বলে তিনি মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে জানান।
এদিকে অবৈধ দখলকারীর হাত থেকে প্রশাসন কর্তৃক সম্প্রতি দখলমুক্ত হওয়া কর্মধার কাটাবাড়ী পানজুমটি শনিবার (২১ নভেম্বর) ঢাকা থেকে বিভিন্ন সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করতে আসেন। পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যা ৬টায় ইছাছড়া পুঞ্জিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন তারা। পরিদর্শন টিমের সদস্য ছাড়াও এসময় সাংবাদিক, বিভিন্ন পুঞ্জির প্রধান ও আদিবাসী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিভিন্ন পুঞ্জির নেতৃবৃন্দ তাদের মতামত তুলে ধরে বলেন, অর্জুন কান্তি দস্তিদার কুলাউড়ার মুরইছড়া বনবিট কর্মকর্তা। প্রায় ৯ মাস থেকে তিনি মুরইছড়া বিটে দায়িত্ব পালন করছেন। গত করোনাকালীন সময় থেকে নলডরি বনবিটে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এ দুই বনবিটে দায়িত্ব পেয়ে তিনি নিজেকে ‘সোনায় সোহাগা’ পাওয়া মনে করছেন। তিনি এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন যে, তার বিরুদ্ধে কেউ (আদিবাসী) কথা বললে আর রেহাই নেই। শিকার হতে হয় মিথ্যা মামলার। তার বিরুদ্ধে উঠেছে চাঁদাবাজির অভিযোগও। সামাজিক বনায়নের নামে বাঁশ-গাছ কেটে সাবাড় করার অভিযোগও তুলেন তারা। তারা বলেন, তিনি বনের রক্ষক নয়; যেন ভক্ষক। তার যড়যন্ত্রে মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোক। খাসিয়াদের কাছে তিনি বিভিন্ন সময় চাঁদা দাবী করে থাকেন। চাঁদা না দিলে একেক সময় একেক মামলায় জড়িয়ে রাখেন ওই বিট কর্মকর্তা। গাছ চুরি, বাঁশ কাটা ও জমি জবর-দখলের নামে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে অযথা তাদের হয়রানি করা হয়। বনবিভাগের কোন নিয়ম-নীতিই তিনি তোয়াক্কা করছেন না। লবণছড়ার বাসিন্দা কয়েকজন আদিবাসী জানান, পূর্ব পাহাড়ে (লবণছড়া মৌজা) বনবিভাগের জায়গা নেই। এটা খাস খতিয়ানের জায়গা। বনবিভাগ এই জায়গা এখন তাদের বলে দাবী করে।
মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা বলেন, গত ১৬ নভেম্বর সোমবার বাঁশ কাটার মিথ্যা অভিযোগ এনে লবণছড়া থেকে স্টেপ সুতনা (২৫) নামক এক খাসিয়া যুবককে আটক করা হয়। স্টেপ সুতনা পানজুমে শ্রমিকের কাজ করত। ওইদিন লবণছড়া মৌজার ভিতর একটি পানজুমে শ্রমিকের কাজ করছিল সে। বনবিভাগের কিছু লোক জুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মহালের রাস্তাটি দেখিয়ে দিতে সহযোগিতা চান স্টেপ সুতনার। সে রাস্তা দেখিয়ে দিতে গেলে পরিকল্পিতভাবে তাকে সেখান থেকে আটক করে বাঁশ কাটার অভিযোগে মুরইছড়া বিটে নিয়ে যান তারা। পরে বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার স্টেপ সুতনাকে আসামী করে আদালতে একটি মামলা (নং সিআর ৭৭/২০ তারিখ: ১৬/১১/২০) দায়ের করেন।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন- পাাহড়ে খাসিয়ারা বসবাস করে। পাহাড় বাঁচলে খাসিয়ারা বাঁচবে। গাছের সাথে পানের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। খাসিয়ারা আদিকাল থেকেই পাহাড়ের গাছ, বাঁশ লালন করে আসছে। মূলত বনবিভাগ স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে এসব বাঁশ মহাল উজাড় করছে। তাদের এসব অপকর্ম আড়াল করতে খাসিয়াদের উপর মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে। আর সামাজিক বনায়ন হবে খালি জায়গায়; গাছ উজাড় করে নয়। পাহাড়ে তো গাছের অভাব নেই। কেন এসব গাছ কাটা হবে? তাছাড়া পুঞ্জির লোকদের কাজের জন্য রড, বালু কিংবা সিমেন্ট পুঞ্জির উপরে তুলতে দেওয়া হয়না। বাধা দেন বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার। আদিবাসী নেতৃবৃন্দ এই বিট কর্মকর্তার অপসারণ দাবী করেন। পাশাপশি কাটাবাড়ী পুঞ্জির মতো অন্য কোন পুঞ্জি যাতে দখলদারীরা দখল করতে না পারে সেজন্য প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন তারা।
মতবিনিময় সভায় পরিদর্শন টিমের মধ্যে ছিলেন- মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এভিলিনা চাকমা, বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, হবিগঞ্জ বাপার সাধারণ সম্পাদক তফাজ্জল সোহেল, সংগঠক ও বাপার কেন্দ্রিয় সদস্য আ.স.ম সালেহ সোহেল, নিজেরা করি’র মিজানুর রহমান, আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক রিপন বানাই,
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি সিলেটের আল আমিন, বাপা হবিগঞ্জের ডা. আলী আহসান চৌধুরী ও এএলআরডি’র এ.কে.এম বুলবুল আহমেদ, ফাদার যোসেফ গোমেজ ও আদিবাসী নেত্রী ফোরা বাবলী তালাং প্রমুখ।
আনীত অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুরইছড়া বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার জানান, পুটিছড়া ও লবণছড়া পুঞ্জিসহ বিভিন্ন পুঞ্জিতে খাসিয়ারা গাছের মাথা কেটে ফেলে রেখেছে। তারা ১-২ বছর পর পর গাছের মাথা ও ডাল কেটে দেয়। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। লবণছড়ায় টিনশেডের একটি ঘর নির্মাণের খবর পেয়ে আমরা সেখানে উপস্থিত হই। সেদিন বনবিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরো জানান, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি খাসিয়ারা যাতে পুঞ্জিতে স্থায়ীভাবে স্থাপনা তৈরী না করতে পারে সেজন্য রড, সিমেন্ট কিংবা বালু তুলতে তাদের নিষেধ করেন।
কুলাউড়া থানার ওসি বিনয় ভূষন রায় জানান, লবণছড়ার ঘটনায় খাসিয়া এবং বনবিভাগ পরস্পরকে দায়ী করে থানায় মামলা দায়ের করেছে। সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।